সম্পত্তি নয় সম্পদ ভাবুন

অনিন্দ্য সান্যাল

“পরকীয়া আবার কি কথা..
আপন করেছি বলেই ত “ইতনা কুছ কীয়া..’’
“আসলে বাকিরা loyal প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রতি..আর আমি “প্রেম” এর প্রতি…”
ফি হপ্তায় রবিবার আমাদের পাড়ায় আড্ডা বসে। সবজান্তাগোছের জমাটি আড্ডায় অটল বিহারীর চিতাভস্ম থেকে নিয়ে বিরাট কোহলির কভার ড্রাইভে টাইমিং এর কতটা অভাব ছিল সবই উঠে আসে । এই আগের রবিবার ঝন্টু দা খুব গম্ভীর গলায় বলল এই যে নরেন 497 নিয়ে যে বাড়াবাড়িটা চলছে এটা নিয়ে তুমি কি বলো। নরেন দা বিড়ি একটা লম্বা টান দিয়ে বাছা বাছা শব্দে পরকীয়ার উপর যেই না সশব্দে ভাঙিলো পাষান কারা, অমনি টুক করে চোখ চলে গেল পাড়ার মোড়ে, নিঃশব্দে রিয়া দি তার ছেলের হাত ধরে ঢুকছে পাড়ার ভিতর। এই নরেন দা র রিয়া দি র প্রেম পাড়ায় সর্বজনবিদিত, সবাই জানত, আমরা ভাবতাম আহা বরযাত্রী, কনেযাত্রী সবই খাবো। কিন্তু বিধি বাম । হলো না বিয়ে । আমাদের দিবাস্বপ্নেও পড়লো ছেদ। ঠিক যেদিন এইপথ দিয়ে রিয়া দি বধূ বেশে হারিয়ে গেছিলো , সেদিন নরেন দা র করুণ হৃদয় দু পায়ে মাড়িয়ে গেছিলো কিনা জানার মতো বয়স সেদিন সত্যি ছিল না। আজও নিন্দুকেরা বলে নরেন দা আর রিয়া দি নাকি গড়ের মাঠে গোপনে বাদামভাজা খায় এবং দর্পণা থেকে বেরোতেও নাকি কেউ কেউ দেখেছে। কিন্তু সেটা নিতান্তই নিন্দুকের কথা। নইলে স্ত্রী কন্যা নিয়ে শান্ত শিষ্ট নরেন দা খামোকা এসব করতেই যাবে কেন। যাই হোক রিয়া দি র দিকে চোখ পড়তেই নরেন দা একটু থতমত হয়ে আড়াইবার বিষম খেয়ে বিড়ির উপর রাগটাকে উগরে দিয়ে আবার পরকীয়ার ষষ্ঠীপুজো করতে উদ্যত হলেন।

উপরের ঘটনা টা নিতান্তই বাস্তবধর্মী এবং আপনার আশেপাশে যদি এর সাথে কোনো মিল খুঁজে পান তাহলে লেখক কে ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না। এবার পিছিয়ে যান কয়েক মাস আগে, ধরুন এ বছর ফেব্রুয়ারি নাগাদ আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করলেন দাদা 497 ধারাটা কি বলুন তো, গড়পড়তা বাঙালি এমন ভাব দেখাবে যেন এটা খায় না মাথায় মাখে নাকি বাটিচচ্চড়ি তে ফোড়ন দিতে লাগে, তা জানেন না? আবার কিছু ‘বং’ বিজ্ঞের মতো বলে দিতেই পারেন ওই তো বধূ নির্যাতনের কোনো আশেপাশের ধারা। আরে বাবা 497 আর 498 পাশাপাশি কিনা! কিন্তু এখন ঘরে ঘরে পাড়ায় পাড়ায় চায়ের কাপে ঝড় তুলে দেওয়ার মতো জ্ঞান নিয়ে আমরা স্বমহিমায় উত্তীর্ণ। কি জানতে চান বলুন না বনগাঁ টু ব্যারাকপুর কোনো ট্রেনেই আমাদের থেকে বড় বিশেষজ্ঞ পাবেন না। এর উপর আবার সমকামিতা মানে 377 ধারা। যুগ যুগ জিও সুপ্রীম কোর্ট। পুজো অব্দি এমন সব আলোচনার বিষয় বোনাস হিসেবে দিয়েছ যা চাকুরিরত বাঙালি সারাজীবন কলম পিষে ও পায়নি।

তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম, পরকীয়া এবং সমকাম সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে চলার একটি ধাপ। আমার বউ বা বর অমুকের সাথে..ছিঃ পাড়ায় মুখ দেখাবো কি করে কিংবা আমার ছেলে বা মেয়ে বিয়ে করবে না স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে না কাপুর সাব কেয়া কেহেঁগে। আরে বাবা হতাশ জীবনে আশার আলো সেটা তো হতে পারে না। আপনাকে হতাশ জীবন নিয়েই চলতে হবে। সেভেন ইয়ার ইচ সে তো গুগুল বলে তাই আপনিও বলবেন? আশ্চর্য ! আমাদের সংস্কৃতি পরম্পরা বলে তো ব্যাপার আছে নাকি। বিগ বি- র ডায়লগটা শোনেন নি ? ওরকম আইকনিক লোক কি মিথ্যে বলবেন? ও দাদা জানেন না উনিও সিলসিলা করেছিলেন। উফফ সেটা ফ্লপ। আর যদি মেনেও নিই যে, করলো না হয় আমার ইসে একটু ক্লিশে। তাই বলে সমকাম? প্রকৃতির নিয়ম। চাট্টিখানি কথা নয়। আরে বাবা বিয়েতে কি গান চালাবো মা কা লাডলা বিগার গ্যায়া। আপনি কি চান আমি যখন বরণ ডালা নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াবো তখন আমার এই কনফিউশন হোক যে আমি আমার জামাই কে বরণ করছি না আমার বৌমাকে। আচ্ছা আহাম্মক তো আপনি। শুনুন আমাদের এই মহান সংস্কৃতি এই ঐতিহ্য এই গরিমা শুধু সুপ্রিম কোর্টের হাতুড়ির আঘাতে ভেঙে যাবে। নিজের বউ সেটা নিজেরই সম্পত্তি, আর চুম্বকীয় নীতি মেনে আমরা বিপরীত মেরুর দিকে নিজেদের মেরুদন্ড হেলিয়ে দেবো। যুগে যুগে আমরাই তো পন প্রথা কে বাঁচিয়ে রেখেছি এবং বাকিজিনিসগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা যে কম করিনি তা তো নয়। কিন্তু ওই কালের নিয়ম আবার কখনও আইনের যাঁতাকলে যাবতীয় ঐতিহ্য পরম্পরা এখন হিমঘরের বন্দি রূপকথা। তাই আমরা সত্যরে সহজে নিতে পারি না আর নেবোও না।

এবার টুক করে চোখ ঘুরিয়ে সেটা কে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনুন দেখবেন, দৈনন্দিন জীবনে যা পড়ছেন বা শুনছেন তার অনেকটাই অর্ধসত্য। মানে ওই দুর্গা ঠাকুরের ভুবন মোহিনী মৃন্ময়ী রূপ দেখে বিভোর হলেও টুক করে পেছন দিকে উঁকি আমি আপনি কখনোই মারিনি। মারলে জানতে পারতাম মৃন্ময়ী রূপের পেছনে আছে বাঁশ কাঠামো আর এবড়োখেবড়ো ভাবে ল্যাপা মাটি। আমাদের দেশের নয়া পরকীয়া আইনটিও অনেকটা সেরকমই। হইহই করে কলরব তুললাম পরকীয়ার বৈধতা নিয়ে কিন্তু আসলে জানতে চাইলাম না বিশদে। পরকীয়া আগে ছিল ফৌজদারী কোর্টে , এখন সামাজিক কোর্টের আওতায়। শুধু পার্থক্যটা এটাই । আগে পরকীয়া প্রমানিত হলে জেল হতে পারতো, এখন বড়জোর বিবাহ বিচ্ছেদ। কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য ঘোষণা যেটা হলো স্ত্রী স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আগে যেখানে একজন স্বামী অনায়াসে তার স্ত্রীর প্রেমিকের বিপক্ষে চাইলে মামলা করতে পারতো এখন সেটি হচ্চে না গুরু। মুশকিল টা এখানেই। আর এই ছোট্ট এবং দৃঢ় ঘোষণাটাকে মানতেই আসমুদ্রহিমাচলের আপত্তি। আচ্ছা আমরা আমাদের স্ত্রীকে সম্পদ ভাবতে পারিনা? সম্পদ তো শক্তিশালী করে আর সম্পত্তি একটু হলেও দুর্বল ! দুটো ব্যক্তির মধ্যে ফাঁক থাকলে তবেই তো তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ হয় , অনেকটা বাঁধের মতো যেমন একটু ছিদ্র দিয়ে জল ঢুকে যেমন গোটা বাঁধটা ভেঙে দিতে পারে তেমনি সূক্ষ্ম ফাঁক ও একটা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে পরকীয়া ডেকে আনতে পারে। আমার ছোটবেলায় যুবরানী ডায়নার মৃত্যু তখনকার দিনের সবচেয়ে আলোচিত মৃত্যু। লোকে চোখের জল ফেললো। আহা উহু করলো , কেউ কেউ বললো কি দেখতে ছিল মাইরি। কিন্তু আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম সাথে ছিলো তাঁর প্রেমিক ডোডি আলফার আর সম্পর্কটাও ছিল পরকীয়া।

আসলে ভালোবাসা বৈধ , অবৈধ, লিঙ্গ দিয়ে কি নির্ধারণ করা যায়। ধরা যাক রবীন্দ্রনাথ ঠিক এখন গোরা উপন্যাস লিখলেন, গোরা এবং বিনয়ের সম্পর্ক আজ অবধারিত সমকামিতার আখ্যা পেতই এবং গোরার গোঁড়া বাবা ন্যায্যভাবেই ত্যাজ্য পুত্র করে দিতেন। আবার সলমন খানের শার্ট লেস দেখে যদি আপনার ছেলে সিস দেয় ঘাবড়াবেন না। আদাত ডাল লো। হতেই পারে আপনার ছেলে কোনোদিন একটা সুঠাম বা পেলব কোনো ছেলেকে নিয়ে এলো বা আপনার এলোকেশী মেয়ে একটা টম বয় মার্কা কোনো মেয়েকে নিয়ে তার বেডরুমে ঘন্টার ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটায়। ‘সত্যরে লও সহজে’। হতেই পারে তাদের ওরিয়েন্টেশন আলাদা সবার থেকে কিন্তু তারাও তো ভালোবাসতে পারে। শাসন শুধু শোষণই করে, ছোটবেলা থেকে যদি সমস্ত শখ আহ্লাদ পূরণ করে থাকেন তাহলে তার বড়ো বেলার ইচ্ছেগুলোকেও মেনে নেওয়ার অভ্যাস করুন। ভুলে যাবেন না বিদ্যাসাগর বিধবার সাথে তার নিজের ছেলের বিবাহ দিয়েছিলেন। সেটাও সমাজ তখন মেনে নেয়নি।

কোনো সামাজিক অবক্ষয় তার নীতি রীতি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করতে কোনোদিনই উৎসাহী নই। শুধু ঘোমটার তলায় খ্যামটা নাচা তে আপত্তি। আমরা আসলে সবই মেনে নিই কিন্তু বড্ড দেরিতে তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমরাও স্বাধীন হবো মুক্ত হবো মানসিক ভাবে। ওই যে কথায় আছে না বেটার লেট দ্যান নেভার।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
অঙ্কন : শিল্পী ভূপেন খাখর

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s