কলকাতার বস্তি – একটি আর্থসামাজিক প্রেক্ষিত

মহালয়া চট্টোপাধ্যায়

বস্তির নানারকম সংজ্ঞা আছে – বস্তি সম্বন্ধে তথ্য যেখান থেকে পাওয়া যায়, সেই সেন্সাস আর এন এস এস ও –র কাছে বস্তি শব্দটির অর্থ আলাদা, প্রায় প্রতিটি রাজ্য তাদের বস্তি উন্নয়নের জন্য যে আইন, তাতে ‘বস্তি’কে নিজেদের মত করে সংজ্ঞায়িত করেছে। প্রণব সেনের নেতৃত্বে বাসস্থানের স্বল্পতা নির্ণয়ের জন্য যে কমিটি হয়েছিল, সেটি আবার অন্য একটি সংজ্ঞা তৈরী করে। সরকারি খাতায় কোন বস্তি স্বীকৃত, কোন বস্তি অস্বীকৃত, কোন বস্তি ‘পঞ্জীকৃত’, কোন বস্তি পঞ্জীকৃত নয় – আবার কোনটি একেবারেই ঝুগগি- ঝোপড়ি। বস্তি উন্নয়ন হবে কি হবে না সেটা নির্ভর করে সেটা স্বীকৃত বা পঞ্জীকৃত কি না – সে তার বাহ্যিক অবস্থা যাই হোক না কেন। সবচেয়ে অবস্থা খারাপ হ’ল জবরদখল কলোনিগুলোর – সরকারি খাতায় যাদের কোন অস্তিত্ব নেই।

বস্তি ঔপনিবেশিক সভ্যতার অবদান, গ্রাম থেকে আসা গরিব মানুষের বাসস্থান হিসেবে। শহরে নানারকম কাজ করার জন্য নানারকম লোকের দরকার হয়েছিল –আর তারা এসে থাকতো এই বস্তিগুলিতে। কলকাতার অনেক বস্তির উৎস জমিদারেরা – তারা তাদের গার্হস্থ্য এবং জমিদারি কাজের জন্য যে লোক আসতেন, তাদের থাকার জন্য এই একতলা ঘিঞ্জি বসত বাড়িগুলি বানিয়েছিলেন। কারখানার মালিকরা তাদের শ্রমিকদের জন্য ‘কুলিব্যারাক’ তৈরি করেছিলেন। আবার অনেক সময়ে কিছু ব্যবসায়ী লোক বাসস্থানের যোগান দিতে অন্যের জমিতে বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিতেন। আবার কোন সময়ে অভিবাসী মানুষ শহরের ফাঁকা জমিতে স্রেফ বসে পড়ে মাথার ওপর আচ্ছাদন তৈরি করতেন । এখন শুরু যেভাবেই হোক বস্তি মানে একটা ঘিঞ্জি বসবাসের জায়গা, যেখানে পরিকাঠামো ও পুরপরিষেবার অভাব প্রকট, জল এবং জঞ্জাল পরিষ্কার অনিয়মিত – পরিচ্ছন্নতা সীমিত। আইনি জটিলতা সমস্যা আরো বাড়িয়ে দেয়।

একসময়ে ভাবা হোত বস্তি বড় শহরের ব্যাপার – সেখানে শুধু গ্রাম থেকে আসা খেটে খাওয়া মানুষের ভিড়। আলাদা করে বস্তির কোন তথ্য পাওয়া মুশকিল ছিল, তাই পুরো আলোচনা চলত শোনা কথার ভিত্তিতে। ২০০১ সালের জনগণনাতে প্রথম আলাদা করে বস্তির তথ্য পাওয়া গেল – কিন্তু তাও শুধু মহানগরীগুলির জন্য। ২০১১ সালে প্রথম সব শহরের জন্য পৃথকভাবে বস্তির তথ্য আমাদের চোখ খুলে দিল। দেখা গেল ভারতের ২৬১৩টি শহরে বস্তি আছে – এবং তা বড় থেকে ছোট সব শহরেই। মোটামুটি ভাগটা সারণী ১-এ রইলো।

সারণী ১
সারণী ১

বস্তি তাই এখন আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে – আমরা এখন আর বস্তিকে গরিব অভিবাসী শ্রমিকের সাময়িক বাসস্থান ভেবে পার পাবো না। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে প্রথম বস্তির দিকে সরকারের নজর পড়ে। ১৯৫৬ সালে বস্তি অপসারণের জন্য কেন্দ্রীয় আইন তৈরি হয় – দেশের চারটি প্রধান মহানগরীগুলিতে এই আইন প্রযোজ্য হয়। এই আইনে বলা হয়েছিল শহরাঞ্চল থেকে সব বস্তি সরিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নবনির্মিত বাড়িতে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন দেওয়া হবে। এই প্রচেষ্টা কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হল। প্রথমতঃ দেখা গেল বস্তিবাসীদের তাদের কাজের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, অনেকের কাজের জায়গাই ছিল বস্তির ঘর। দ্বিতীয়তঃ ব্যক্তি মালিকানার বস্তিতে সরকারের পক্ষে কিছু করাই সম্ভব নয়। সত্তরের দশকের শুরুতে প্রায় সারা ভারতের বিপরীতে গিয়ে কলকাতা মহানগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (KMDA) শুরু করলেন বস্তি উন্নয়ন – অর্থাৎ বস্তির ভেতরেই পানীয় জল, নিকাশিব্যবস্থা, শৌচাগারের ব্যবস্থা করে এগুলিকে মনুষ্য বাসযোগ্য করে তোলা। কিছু খামতি থাকলেও এই প্রকল্পটির সাফল্য ভারত সরকারকে বাধ্য করেছিল সারা ভারতের বস্তির জন্য Environmental Improvement of Urban Slums (EIUP) নামের একটি প্রকল্প তৈরি করতে। এ নানাভাবে চেষ্টা হয়েছে বস্তি অপসারণের, কিন্তু দেখা গেছে বস্তি তুলে দিলেও প্রায় রক্তবীজের মত অন্যরূপে সে ফিরে এসেছে। এবং দেখা যাচ্ছে যে বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে সব মাপের শহরে – কিছু ছোট শহরে প্রায় ৮০% মানুষই বস্তিবাসী। তাই এটা আসলে শহরে জমির বাজারের অসম্পূর্ণতা ও অকার্যকারিতার ফল – যার যেখানে থাকা উচিত সে সেখানে থাকার জায়গা পায় না –অতএব তাকে যেভাবেই হোক একটা মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজে নিতে হয় – সেখানে জীবনধারণের অন্য ব্যবস্থা থাক বা না থাক।

আগেই বলেছি বস্তি সম্বন্ধে লেখার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল প্রামাণিক তথ্যের অভাব। জনগণনার তথ্য আলাদা করে পাওয়া যায় মাত্র ২০০১ থেকে, তাও শুধু মহানগরীগুলির জন্য। জাতীয় নমুনা সমীক্ষা মাঝে মাঝে বস্তির সমীক্ষা করেছে, কিন্তু তার থেকে একটি শহরের তথ্য পাওয়া যায় না।২০১১ সালের জনগণনার তথ্য খুব বিস্তৃত, তাতে বস্তির ঘরের ব্যবহার থেকে শুরু করে আরো অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু বস্তির অর্থনৈতিক পরিসর নিয়ে তথ্য স্বাভাবিকভাবেই তাতে নেই। তাই বস্তির মানুষের রুটি-রূজির সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান-গম্যি বড়ই কম। সম্প্রতি কলকাতা পৌর নিগমের করা একটি সমীক্ষাতে এই বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তার ওপরে ভিত্তি করেই এই লেখা।

কলকাতা পৌর এলাকার ১৪১ (জোকা সংযোজিত হ’বার আগে) ওয়ার্ডের মধ্যে ১৯টিতে কোন বস্তি নেই। শহরে মোট বস্তি আছে ১৪৬০ – যা কি না পৌরনিগম কর্তৃক স্বীকৃত। এই ১৪১টি ওয়ার্ডকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৫টি বরোতে ভাগ করা হয়েছে । নীচের মানচিত্রে এই ভাগ দেখানো হয়েছে।

কলকাতার মানচিত্র (বরো অনুযায়ী)

কলকাতার বস্তির ভৌগোলিক বিন্যাস বুঝতে সারণি ২ দেখা যাক।

সারণী ২

একটু খেয়াল করে দেখলে বুঝতে পারবেন শহরের উত্তরপ্রান্তে ১ নম্বর বরো বাদ দিলে, বস্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি শহরের কেন্দ্রস্থলে – ৬,৭, ৮ এবং ৯ নং বরোতে। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বস্তি ৭নং বরোতে – যা কিনা অভিজাত পার্ক স্ট্রীট থেকে পূর্বপ্রান্তে ধাপা অবধি বিস্তৃত। ৮ নম্বর বরোও ভবানীপুর-বালিগঞ্জের অভিজাত এলাকাতে – সেখানে এখন এত বস্তি আছে তার কারণ হিসেবে বলা যায় ঠিকা ভাড়াটিয়া আইনের সুরক্ষা। আলিপুর-গার্ডেনরিচ (৯ নং) অবশ্য পুরনো শিল্পাঞ্চল – শ্রমজীবী মানুষের বাসস্থান। সংযোজিত যাদবপুর-বেহালাতে বস্তির সংখ্যা খুবই কম।

এবারে আসা যাক বস্তির মানুষের কাজকর্ম বা জীবিকার কথায় । আমাদের প্রচলিত ধারণায় বস্তির মহিলা মানেই কাজের লোক আর পুরুষদের কাজ সম্বন্ধে আমাদের পরিষ্কার কোন ধারণা নেই। পৌরসভার এই সমীক্ষাতে ৪৬টি জীবিকার তালিকা করা হয়েছিল – তার মধ্যে ৪২টি জীবিকায় কর্মরত মানুষের খোঁজ মিলেছে। তবে কর্মীর হিসেব করতে গিয়ে প্রথমেই চোখ পরে লিঙ্গবৈষম্যে – পুরুষ কর্মীর সংখ্যা যেখানে সাড়ে চার লাখ, সেখানে মহিলা মাত্র বত্রিশ হাজার। সর্বভারতীয় ছবিটাও এরকমই – তাই বস্তির মহিলা মাত্রেই খেটে-খাওয়া – সেই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেয়।

জীবিকার ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে এখানে আইনজীবী থেকে জ্যোতিষী সবাইকেই এখানে পাওয়া যাবে। তবে পুরুষ ও মহিলা – সকলেই কিন্তু সবচেয়ে বেশী করেন চাকরি। কিছু জীবিকায় মহিলার সংখ্যা শূন্য। আবার কিছু জীবিকা কোন কোন অঞ্চলে ঐতিহাসিক কারণে সন্নিবদ্ধ যেমন ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে বেশির ভাগ পুরুষ ছাপাখানা সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত। নীচের দুটি সারণিতে আমরা গুরুত্বের বিচারে পুরুষ এবং মহিলা দুপক্ষেরই পেশা এবং তার সংখ্যা দিলাম।

এই দুটি সারণি থেকে পরিষ্কার যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বস্তিবাসীদের এখন প্রধান জীবিকা চাকরী – কলকারখানার কাজ নয়। তার পরে যে পেশা বাছাইতে যে খুব লিঙ্গ বৈষম্য আছে, তা নয়। খুব কয়েকটি নির্দিষ্ট পেশা (যেমন রিকশাচালক বা ইলেকট্রিক মিস্ত্রী) ছাড়া সব জায়গাতেই মহিলাদের পাওয়া যাচ্ছে। তবে লক্ষণীয় পুরুষদের মধ্যে অস্থায়ী শ্রমিকদের বিরাট উপস্থিতি। এক কথায় বলা যায় নানারকম অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের একটা বড় অংশ বস্তিবাসী।
এবার শেষ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই সেটি হল বস্তিবাসীদের আয়। কলকাতা পৌরনিগমের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বরোভিত্তিক গড় পারিবারিক মাসিক আয় নীচের সারণিতে দিলাম।

এখানে দেখা যাচ্ছে পারিবারিক মাসিক আয় সবচেয়ে কম ১০ নং বরোতে আর সবচেয়ে বেশি ৭ নং বরোতে। জীবিকার ধরন বেশিরভাগ সময়ে আয় নির্ধারণ করে আর আমরা আগেই বলেছি ঐতিহাসিক কারণে শহরের এক এক অঞ্চলে এক এক ধরণের জীবিকার সন্নিবেশ দেখা যায়। মোটামুটিভাবে বলা যায় বস্তিবাসীদের গড় আয় তিন হাজার টাকার মত। ৭ নং বরোতে পারিবারিক আয় বেশি হবার একটা বড় কারণ এখানে মহিলা কর্মীদের উপস্থিতি সর্বাধিক।

এই আলোচনাটিতে আমরা খুব সংক্ষিপ্তভাবে কলকাতার বস্তির একটি আর্থসামাজিক ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। বস্তি ভারতীয় নগরজীবনের অঙ্গ – ছোট থেকে বড় সব শহরেই বস্তি আছে – স্বাধীনতার পর থেকে অনেকবার নানাভাবে বস্তি অপসারণের চেষ্টা হয়েছে – কিন্তু কখনই তাতে সাফল্য লাভ করা যায় নি। কলকাতা দেশকে পথ দেখিয়েছিল কি করে অপসারণ না করে উন্নয়ন করা যায় – তাই বাসযোগ্যতার নিরিখে কলকাতার বস্তি যে কোন শহরের থেকে ভালো। এখানে আমরা মূলতঃ আলোচনা করলাম বস্তির ভৌগোলিক বিন্যাস, বস্তিবাসীদের পেশা আর আয় নিয়ে। আরো অনেক কিছু বলার আছে – তা বারান্তরে হবে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
লেখিকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপিকা
~~~~~~~~~~~~~~~~
ছবি : সাগ্নিক রায়

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s