সৌভিক ঘোষাল

নইপাল ও অভিবাসীর যন্ত্রণা

সৌভিক ঘোষাল

মোহন বিশ্বাসের চাকরিটা চলে গেছিল তিনি মারা যাবার আড়াই মাস আগে। ভুগছিলেন তিনি অনেক দিন ধরেই। শেষমেষ ডাক্তার বলে দেন ত্রিনিদাদ সেন্টিনালের সাংবাদিকতার চাকরিটা ছাড়তেই হবে। চাকরি হারানোর পর স্ত্রী চেয়েছিলেন যা হোক করে সংসার চালিয়ে নিতে। এজন্য অল্প পয়সায় দূর থেকে আলু কিনে এনে বেশি দামে বিক্রি করার ভাবনাও তার মাথায় এসেছিল। মোহন বিশ্বাস অবশ্য তাতে রাজী হননি। তিনি চেয়েছিলেন পুরনো গাড়িটা বিক্রি করে দিতে। ত্রিনিদাদের সিকিম স্ট্রিটের যে বাড়িটায় তিনি থাকতেন সেখানে তার ধার বাড়ছিল ক্রমশ, ধারের চাপে বাড়িটাকে বন্ধকও দিতে হয়েছিল। স্ত্রী শ্যামার কাছেও কোনও টাকা পয়সা ছিল না। বড় যে দুই ছেলে এই বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারত তারা তখন পড়তে চলে গিয়েছে বাইরে।

অথচ কয়েক বছর আগেও, মানে বাড়িটা কেনার আগে পর্যন্ত এ ধরনের অর্থকষ্ট তাদের ছিল না। মোহন বিশ্বাস স্ত্রী শ্যামার বাপের বাড়িতেই থেকেছেন বরাবর বিয়ের পর থেকে। কিন্তু নিজের একটা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি। বাড়ি বানানো শুরুও করেছিলেন একবার। কিন্তু মাঝপথেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই অর্ধনির্মিত বাড়িটা ভেঙে যায়। অবশেষে একচল্লিশ বছর বয়সে তার নিজের একটা বাড়ি হয়। নিজের বানানো বাড়ি নয়। নিজের নামে কেনা বাড়ি। তাও সেটা পুরোপুরি নিজের টাকায় কিনতে পারেন নি মোহন বিশ্বাস। জীবনের সব সঞ্চয় এর সঙ্গে জামাইয়ের থেকে নেওয়া ধারের অঙ্ক যোগ করে এই বাড়িটা কেনেন তিনি।

বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই এর নানা খুঁত চোখে পড়তে থাকে লোকজনের। যেমন সিঁড়িগুলো যেন বড্ড বেশি খাড়া। জানলাগুলোর প্রায় কোনওটাই ঠিকমত বন্ধ হয় না। একটা দরজা তো খোলাই যায় না। প্রথম দিকে নিচু স্বরে তারা বাড়ি সংক্রান্ত এই অসন্তোষগুলো নিয়ে কথা বলত। তারপর এই অসন্তোষগুলো ক্রমেই কমে আসে। এই বাড়িটা তাদের পছন্দের হয়ে ওঠে। অবশ্য নিজের এই বাড়িটায় খুব বেশিদিন সুখ ভোগ করতে পারেননি মোহন বিশ্বাস। অসুখে ভুগতে থাকেন প্রায়ই এবং বাড়ি কেনার মাত্র বছর পাঁচেক পরেই তিনি মারা যান ছেচল্লিশ বছর বয়েসে।

‘এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’ উপন্যাসটি শুধু নইপাল এর প্রথম প্রাতস্বিক রচনা বলেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর মধ্যে তাঁর গোটা সাহিত্য জীবনের নির্যাস ধরা আছে বলেও মনে করা হয়। অভিবাসী মানুষের পরিচিতির সঙ্কটকে বারবার তাঁর লেখায় নিয়ে এসেছেন নইপাল। মোহন বিশ্বাসের আখ্যান দিয়ে তার বলিষ্ঠ সূচনা। মিস্টার বিশ্বাস চরিত্রটি যে তিনি অনেকটা তাঁর নিজের বাবার আদলে গড়ে তুলেছেন এবং সেই জীবনীর অংশ এই আখ্যানে যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে,তা নইপাল নিজেই জানিয়েছিলেন। নইপালের এই লেখা দেখায় অভিবাসী মানুষের নানা ধরনের সঙ্কটকে। সেই সঙ্কট যেমন অর্থনৈতিক তেমনি সাংস্কৃতিক। সবচেয়ে বড় কথা তা আত্মপরিচয়েরও এক বড় সংকট। এই উপন্যাসে নইপাল দেখিয়েছেন মোহন বিশ্বাসের বাবার মৃত্যুর পর কীভাবে প্রতিবেশীদের লোভাতুর দৃষ্টি এই অভিবাসী পরিবারের জমি বাড়ির ওপর এসে পড়ে, তাদের নানাভাবে জর্জরিত করে তোলে এবং শেষমেষ বাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য করে। চাকরির দিক থেকেও বিশ্বাস কখনো থিতু হতে পারেন নি। বাড়ি বা জীবিকার পাশাপাশি তাকে আর একটা সংকট বয়ে বেড়াতে হয়েছে। সেটা একধরনের সাংস্কৃতিক সঙ্কট। তার ছেলেবেলায় দু ধরনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন। প্রথমে ইউরোপীয় শিক্ষা সংস্কৃতি, সেই শিক্ষা শেষে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী এক ব্রাহ্মণের কাছে ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির পাঠ। সনাতন ভারতীয় হিন্দু আদর্শের অনেক প্রাচীনতাকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তার মা, স্ত্রী বা যে শ্বশুরবাড়িতে তিনি থাকতেন সেখানে সবারই ছিল সনাতন সংস্কৃতিতে বিশ্বাস – তাই এদের কারোর সাথেই তিনি ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারেননি। আবার ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় সংস্কৃতিও তার আপনার হয়ে ওঠেনি।

অভিবাসী মানুষের এই সংকট ও দুই সংস্কৃতির দ্বন্দ্বকে নইপাল বারেবারে ফিরিয়ে আনেন তাঁর বিভিন্ন আখ্যানে। নইপালের আরেকটি বিখ্যাত রচনা ‘এ বেন্ড অব দ্য রিভার’ (১৯৭৯) উপন্যাসেও এটা আমরা দেখতে পাই। এই কাহিনীটির পটভূমি আফ্রিকার একটি সদ্য স্বাধীন দেশে স্থাপন করেছেন নইপাল, কিন্তু মধ্য আফ্রিকার দেশ এই সাধারণ পরিচয়ের বাইরে তাকে নির্দিষ্ট করেন নি। এই আখ্যানের নায়কও একজন অভিবাসী ভারতীয়, যার নাম সেলিম। সে আফ্রিকার শহরে এসে নিজের ব্যবসা শুরু করে। সেলিম ছিল ইংরাজী জানা মানুষ। এইজন্য দোকান চালানোর ফাঁকে তার ওপর ভার পড়ে এক স্থানীয় ছেলেকে ইংরাজী শেখানোর। সদ্য স্বাধীন দেশটি দ্রুতই এক রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের মুখোমুখি হয় এবং সেলিম কিছুদিনের জন্য লন্ডনে চলে যান। ফিরে এসে দেখেন তার দোকানটি বাজেয়াপ্ত হয়েছে সরকারের দ্বারা এবং সেখানেই তিনি ম্যানেজার হিসেবে বহাল হন। অতিরিক্ত অর্থের আশায় নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে তার জেল হয়। স্থানীয় এক প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তির সাহায্যে শেষমেশ সেলিম দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন। উপন্যাসের শুরুতে যেরকম এক অনিশ্চিত জীবন থেকে থিতু হবার লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, সেই অনিশ্চিত জীবনেই তিনি আবার ফিরে যেতে বাধ্য হন। মাঝখানে থেকে যায় সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের চিহ্নগুলি।

১৯৭১ সালে প্রকাশিত নইপালের ‘ইন এ ফ্রি স্টেট’ নামে বিখ্যাত বইটি, যা বুকার পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল, তাতে রয়েছে তিনটি আলাদা আলাদা কাহিনী। কাহিনীগুলি আলাদা আলাদা কিন্তু তিনটিতেই রয়েছে অভিবাসন বা দেশান্তরের প্রসঙ্গ। প্রথম গল্পটি বোম্বে থেকে আমেরিকায় এসে পড়া এক চাকরের গল্প। কীভাবে সে নানা অর্থসঙ্কট এবং বেআইনি বসবাসের আতঙ্কে ক্রমশ ডুবে যায় তার আখ্যান। দ্বিতীয় আখ্যানটিতে রয়েছে গ্রামীণ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে কানাডা ও ইংলণ্ডে অভিবাসী হওয়া এক পরিবারের নানা অভিজ্ঞতার কথা। তৃতীয় তথা মূল কাহিনীটি একটি অনামা আফ্রিকান দেশের পটভূমিতে রচিত, যেটি সদ্য স্বাধীন হয়েছে। সেখানকার রাজাকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার একটা পর্বের মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ববি ও লিন্ডার নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যান নইপাল। বলা বাহুল্য সে আখ্যানও সুস্থিত কোনও জীবনের নয়, নইপালের আখ্যানের সাধারণ বৈশিষ্ট্য মেনে নানাভাবে জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল।

নইপাল এর কাছে অভিবাসী জীবন মানে শিকড়হীন মানুষের আত্মপরিচয়ের সঙ্কট। অভিবাসনকে অবশ্য বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে দেখেন নইপাল। শুধু দেশত্যাগ বা গ্রাম শহর ত্যাগ নয়, ধর্মের বদলে যাওয়াও তার কাছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অভিবাসন। ইরান, ইরাক থেকে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ঘুরে সেখানকার মুসলিম জনজীবন নিয়ে দুটি বই লেখেন তিনি। ‘অ্যামং বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি’ (১৯৮১) এবং ‘বিয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকার্শনস অ্যামং দ্য কনভার্টেড পিপলস’ (১৯৮৮)। দ্বিতীয় বইটিতে তার পর্যবেক্ষণ, “ইসলাম আসলে ঔপনিবেশিকতার চেয়েও খারাপ। ইসলাম ধর্ম মেনে নেওয়া মানে সেই জাতিগোষ্ঠী নিজের অতীত অস্বীকার করছে। ইতিহাসকে অস্বীকার করছে। এ যেন বলা, “আমার পূর্বপুরুষের কোনও সংস্কৃতি ছিল না।”

নইপাল সম্পর্কে অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন ইসলামোফোবিয়ার। নারীবিদ্বেষী মন্তব্য নিয়েও স্বাভাবিক ঝড় উঠেছে। এসব আমাদের বর্তমান আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু নইপাল সম্পর্কে একটি প্রবল সমালোচনা নিয়ে আলোচনা এই প্রসঙ্গে জরুরি। এডওয়ার্ড সঈদ, চিনুয়া আচিবি বা নইপালের সমসাময়িক ক্যারিবিয়ান লেখকদের অনেকেই মনে করেছেন নইপাল ইউরোপের বিপরীতে আফ্রিকা এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলকে বেশ নীচু চোখে দেখেছেন। তার চাঁচাছোলা ভাষার কর্কশ বর্ণনায় তৃতীয় বিশ্ব চিত্রিত হয়েছে বীভৎস ভূখণ্ড হিসেবে। পূর্বপুরুষের দেশ ভারত নিয়ে ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ (১৯৬৪) এ তিনি লিখেছিলেন এখানে লোকে সর্বত্র মলত্যাগ করে। রেললাইনের ধারে, মাঠের ধারে, রাস্তার ধারে, নদীর ধারে, সমুদ্রতীরে -কোত্থাও বাকি রাখে না’। আর এক জায়গায় লিখেছেন, “অমুক লোকটা খারাপ। শুধু বাঙালি আর ক্রিমিনালদের সঙ্গে মেশে”। আফ্রিকা সম্পর্কে বলেছেন, “ঠিক-ভুলের কোনও ব্যাপার নয়। ঠিক ব্যাপারটাই এখানে নেই।”

যে ত্রিনিদাদে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তার মধ্যেও তেমন ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাননি নইপাল। ১৯৫০ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ত্রিনিদাদ ছেড়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়তে যান অক্সফোর্ডে। এরপর সেখানেই থেকে গিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বময়। কিন্তু কোথাও নিজেকে খুঁজে নিতে পারেননি। নিজেই নিজেকে বর্ণনা করেছেন একজন শেকড়হীন মানুষ হিসেবে। বলেছেন, তিনি তার লেখাগুলোর সমষ্টিমাত্র। বিভিন্ন প্রশ্নে ন্যায্য সমালোচনার পরেও সাহিত্যিক হিসেবে এই নোবেলজয়ীর মূল কৃতিত্ব অভিবাসী মানুষের শিকড়হীনতা ও অস্তিত্বের সঙ্কটকে, পরিচিতির সঙ্কটকে নানাভাবে অবিস্মরণীয় দক্ষতায় লেখায় তুলে আনতে পারা।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ভি এস নইপাল এর ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s