চন্দন বাড়ৈ

বিজ্ঞানে নোবেল এবং নারী

চন্দন বাড়ৈ

আপনি , যিনি লেখাটি পড়ছেন আপনার আশে পাশের যেকোন মানুষকে একটি প্রশ্ন করুন। জিজ্ঞেস করুন “তিন জন মহিলা বিজ্ঞানীর নাম বলো?” দেখুন তো কজন পারে? আপনি নিজেও কি পারলেন? যদি না পারেন তবে এই লেখাটি পড়া আপনার জন্য জরুরী।

মেরি কুরি
মেরি কুরি

আচ্ছা কখনো ভেবেছেন বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এদের লিঙ্গ পরিবর্তনের সময় আগে কেন স্ত্রী বাচক শব্দ যোগ করতে হয়? আগের প্রশ্নের থেকে এর উত্তর অনেক সহজ।উত্তরটা হল, অপ্রয়োজনবোধ থেকে। আগে ব্যকরণবিদদের কখনো স্ত্রী বাচক হিসেবে এই শব্দগুলিকে ব্যবহার করতে হয়নি , তাই সৃষ্টিও হয়নি আলাদা স্ত্রী বাচক শব্দ । পরবর্তীতে এই পেশা গুলিতে পুরুষদের পাশে ধর্ম-সমাজের রক্তাক্ষ উপেক্ষা করে মহিলারাও যখন এগিয়ে এলেন তখন মহিলা-বিজ্ঞানী, মহিলা-গণিতজ্ঞ ইত্যাদি মিলিত-শব্দের উৎপত্তি করতে হলো। যাই হোক মহিলা বিজ্ঞানী বলতে প্রথমে যার নাম সাধারণত মনে আসে তিনি হলেন, মেরি কুরী। উনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন একবার নয়, দু বার এবং বিজ্ঞানের দুই শাখা রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার আজ পর্যন্ত আর কেউ পায়নি। বিজ্ঞানের জটিলতম সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা থাকলেও একটি দেশের শাসককে নির্বাচন করার ক্ষমতা দেয়নি তাকে সমাজ।কারণ তখনও মেয়েদের ভোটের অধিকার ছিলনা। একই কারনে মেরী কুরীর কাছে ছিলনা বহু বিখ্যাত বিজ্ঞান সংগঠনের সদস্য হবার সুযোগ। এরপর কেটেছে প্রায় ৬০ বছর। ততদিনে মেয়েরা ভোটের অধিকার পেয়েছে। পেয়েছে না বলে বলা ভালো ন্যায্য দাবি আদায় করে নিয়েছে। সালটা ১৯৬৩ , পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার তালিকা ঘোষণার পর সান দিয়েগো শহরে তখনকার একটি বিখ্যাত দৈনিক কাগজে হেডলাইন ছিল “Mother wins nobel”। প্রাপক ছিলেন মেরি গোয়েপার্ট মেয়ার। সেযুগের সমাজে তার বিজ্ঞানী কিংবা অধ্যাপিকা পরিচয়ের থেকেও সমাজ তার সন্তান জননী মাতৃরূপ কে বড় করে দেখেছিল। দাঁড়ান, হে বাঙালী পাঠক। মাতৃ পূজা দেখেই ভাবে গদ গদ হবেন না। বরং তলিয়ে ভেবে দেখুন আসলে মাতৃ রূপ কে মহান করে অলীক সান্তনা দিয়ে নারীর ‘নারীত্ব’কে চিরকাল অবমাননা করেছে সমাজ, তার অন্য পরিচয় গুলিকে দাবিয়ে রেখেছে এই প্রশংসার ছদ্মবিষে । নারীকে মাতৃ রূপে সম্মান অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু তার বাকি পরিচয় গুলিকে অবহেলা করে নয় বরং সমাদরে সকল পরিচয়কেই সহবস্থান দেওয়া প্রয়োজন। মারিয়া গোয়েপার্ট মেয়ার কেও নারী হবার সুবাদে চাকরি জীবনে ভোগ করতে হয়েছে নানান অসুবিধা। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে কাজ করতে হয়েছে নূন্যতম দয়াসুলভ বেতনে। এমনকি আমেরিকার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ক্লাসে পড়াতে দিলেও এক পয়সা বেতন দিতে সম্মত ছিলনা। একসময় সেই নূন্যতম বেতনের চাকরিটাও তাকে খোয়াতে হয়েছিল মেয়ে হবার দরুন। অথচ তিনিই জটিল অঙ্ক কষে বের করে ছিলেন নিউক্লিয়ার শেল মডেল। দেখিয়েছিলেন একটি পরমাণুর বাইরে যেরকম বিভিন্ন শক্তিস্তরে বিভিন্ন সংখ্যক ইলেকট্রন বিন্যস্ত থাকে, খানিকটা সেভাবেই নিউক্লিয়াসের ভেতরেও প্রোটন , নিউট্রনেরা বিভিন্ন শক্তিস্তরে বিন্যস্ত থাকে।

মেরি গোয়েপার্ট মেয়ের
মেরি গোয়েপার্ট মেয়ের

পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে এর প্রায় পঞ্চান্ন বছর পর ২০১৮সালে আবার কোন মহিলা বিজ্ঞানী ভূষিত হলেন এই বিরল সম্মানে। তিনি হলেন ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড।ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের জন্ম কানাডায়।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার পর যোগদেন রোচস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ ডি করার জন্য।ডোনার অবদান হল Chriped pulsed laser বা সংক্ষেপে CPA পদ্ধতির লেজার রশ্মি তৈরি করা। এই পদ্ধতি প্রয়োগে লেজার রশ্মিকে বিবর্ধিত করে অতীব শক্তিশালী করা যায়। ফলে একটি টেবিলের ওপরের মত ছোট জায়গাতেই তৈরি করা যায় খুব ক্ষুদ্র জায়গায় ফোকাস করার মত শক্তিশালী লেজার রশ্মির যন্ত্র। এই পদ্ধতির প্রয়োগ সুদূর প্রসারী ও ব্যাপক।এই গবেষণা থেকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে চালু হয়েছে উন্নত লেজার সার্জারী, একই বিষয়ে গবেষণায় তার সঙ্গেই নোবেল পেয়েছেন তার গাইড জেরার্ড মোরু, কিন্তু অবাক করার মত ব্যাপার হল নোবেল পাওয়ার আগে পর্যন্ত উইকিপিডিয়ায় ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের নামে কোন পেজ ছিলনা।অথচ জেরার্ড মোরুর বেলায় তা হয়নি। এ থেকে আবার প্রশ্ন উঠেছে তবে কি উইকিপিডিয়ার নিয়মাবলী পুরুষের সুবিধাঘেষা? উইকিপিডিয়া অবশ্য বরাবরের মতই অবিশ্বাস্য দ্রুততার সাথে ভুল শুধরে নিয়েছে। তবে নারী গবেষক ও তাদের গবেষণাগুলি যে প্রচারের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সারিতে থাকে সে অভিযোগ ছিল বহুদিনের।এই ঘটনা হয়তো তাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল।

বিজ্ঞানের জগতে নারীদের সংখ্যা সবসময়েই কম। আজ পর্যন্ত মাত্র উল্লিখিত তিনজন মহিলা বিজ্ঞানীই পেয়েছেন ফিজিক্সে নোবেল , এরাই পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের ‘তিন কন্যা’। বিজ্ঞানের বাকি শাখার মধ্যে পাঁচজন(মোট প্রাপক ১৮০) কেমিস্ট্রিতে, বারো জন(মোট প্রাপক ২১৬) জীববিদ্যায় আর অর্থনীতিতে(মোট প্রাপক ৮১) নোবেল পেয়েছেন কেবলমাত্র একজন, এলিনোর অসট্রম। বিজ্ঞানে মোট নোবেল প্রাপকদের ৯৭শতাংশ হলেন পুরুষ, মাত্র তিন শতাংশ নারী।

ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড
ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড

তবে এহেন অসাম্য থাকলেও নারীবাদের প্রচার ও প্রসার বিজ্ঞানের সাথে সকল বিষয়ের দিকে নারীদের এগিয়ে আসাতে সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলছে একথা মানা প্রয়োজন ।কারণ পুরস্কারের সম্মাননা দিয়ে দেখলে ফার্স্ট ওয়েভ অফ ফেনিমিসম এর ৫০ বছরের সময়কালে সকল বিষয় মিলিয়ে ১১জন মহিলা নোবেল পেয়েছেন। সেকেন্ড ওয়েভের সময়কালে ১০ জন , তৃতীয় ওয়েভের সময় কালে ১২ জন আর বর্তমান চতুর্থ ওয়েভের সময়কালে মোট ১৬ জন । ফেমিনিজম এর সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্ক নেই বলে মনে হলেও, এক বছরে গড় মহিলা নোবেল বিজয়ীর সংখ্যা চারটি ওয়েভে যথাক্রমে ০.২২,০.৫,০.৬৬ থেকে চতুর্থ ওয়েভের সময়ে একলাফে ১.৬৬ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে পাঁচটি বিষয়ে মোট ছজন মহিলা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কোন একটি বছরে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যক মহিলা বিজয়িনীর সংখ্যা।এবছর মোট তিনজন নারী , ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড ছাড়াও রসায়নে ফ্রাঞ্চেস আর্নল্ড এবং শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন নাদিয়া মুরাদ। নিন্দুকে কবেন কোন একটি পুরস্কার প্রাপ্তির বিচারে মেয়েদের কোন একটি বিষয়ে ইনভলভমেন্ট বিচার হয়না। কিন্তু কথা হল পুরস্কারটি যদি হয় পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্খিত,সমাদৃত,সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতীক স্বরূপ, তবে তাতে নারীদের প্রাপ্তির হিসাব তাদের অবদানের, সুযোগপ্রাপ্তির প্রতিফলন। এক সময় বিদুষী হাইপেশিয়াকে নগ্ন করে রথের পেছনে বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যতক্ষণ না তার কঙ্কাল থেকে খসে পরে সব মাংস, সেই বর্বরতার যুগ থেকে পিছিয়ে পড়া পথ এখনও বেশ কিছুটা বাকি।ইউনেস্কোর রিপোর্ট বলছে এতদিনের ব্রাত্য ভাব পেরিয়ে এসেও এখনও বিজ্ঞানের গবেষকদের মাঝে মাত্র ৩০শতাংশ হলেন মহিলা।বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ , অর্থনীতিবিদ, জীববিদ ইত্যাদি হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল ক্ষেত্রে আরও বেশী সংখ্যায় এগিয়ে আসুক নারীরা। সমাজ-ধর্ম-সঙ্কীর্ণপুরুষের বিরুদ্ধে নারীদের জয় হোক। সমাজ সমান সম্মানের চোখে দেখুক মাতৃ, দেবী রূপ ছাড়াও নারীকে অন্য সকল রূপে । সেদিন যেন আর দূরে না থাকে যেদিন লিঙ্গসাম্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নারীবাদ হবে সময়-অপযোগী, অপ্রয়োজনীয়, বাহুল্য।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ছবি : uwaterloo.co, Wikipedia

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s